খোরাসানের ছায়া: আইএসকেপি (ISKP)-এর ভিডিও প্রচারণার চ্যালেঞ্জ এবং মুসলিম বিশ্বের বিশ্বাস রক্ষা

খোরাসানের ছায়া: আইএসকেপি (ISKP)-এর ভিডিও প্রচারণার চ্যালেঞ্জ এবং মুসলিম বিশ্বের বিশ্বাস রক্ষা

Hai Newme@hainewme
2
0

এই নিবন্ধটি 'খোরাসান প্রভিন্স' (ISKP) চরমপন্থী সংগঠনের সাম্প্রতিক প্রচারণামূলক ভিডিও এবং মুসলিম উম্মাহর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। এতে তাদের ধর্মতাত্ত্বিক বিকৃতি এবং ভূ-রাজনৈতিক ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

নিবন্ধের তথ্যসূত্র

এই নিবন্ধটি 'খোরাসান প্রভিন্স' (ISKP) চরমপন্থী সংগঠনের সাম্প্রতিক প্রচারণামূলক ভিডিও এবং মুসলিম উম্মাহর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। এতে তাদের ধর্মতাত্ত্বিক বিকৃতি এবং ভূ-রাজনৈতিক ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

  • এই নিবন্ধটি 'খোরাসান প্রভিন্স' (ISKP) চরমপন্থী সংগঠনের সাম্প্রতিক প্রচারণামূলক ভিডিও এবং মুসলিম উম্মাহর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। এতে তাদের ধর্মতাত্ত্বিক বিকৃতি এবং ভূ-রাজনৈতিক ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বিভাগ
ফ্রন্টলাইন আপডেট
লেখক
Hai Newme (@hainewme)
প্রকাশিত
২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ এ ১১:৪৪ PM
হালনাগাদ করা হয়েছে
৫ মে, ২০২৬ এ ০১:২৪ PM
প্রবেশাধিকার
সর্বজনীন নিবন্ধ

ভূমিকা: ডিজিটাল যুগের 'ফিতনা'

২০২৬ সালের শুরুর দিকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে তথাকথিত 'ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স' (ISKP) তাদের অত্যন্ত উন্নত ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের ওপর আবারও একটি ছায়া ফেলেছে। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ, আইএসকেপি-র আজাইম মিডিয়া ফাউন্ডেশন তাদের ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনা 'ভয়েস অফ খোরাসান'-এর ৩৮তম পশতু সংস্করণ প্রকাশ করে। এটি প্রমাণ করে যে, দীর্ঘ নীরবতার পর সংগঠনটি বহুভাষিক ভিডিও এবং ডিজিটাল কৌশলের মাধ্যমে পুনরায় তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে [SpecialEurasia](https://www.specialeurasia.com/2026/02/06/iskp-voice-of-khorasan-38/)। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য 'খোরাসান ভিডিও' নামে পরিচিত এই প্রচারণামূলক উপাদানগুলো কেবল একটি নিরাপত্তা হুমকিই নয়, বরং এটি একটি গুরুতর 'ফিতনা' (বিশৃঙ্খলা ও পরীক্ষা)। তারা ইসলামি শিক্ষার অপব্যাখ্যার মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি এবং মুসলিম দেশগুলোর স্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক স্বার্থ ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।

ডিজিটাল খারিজি: আজাইম মিডিয়ার বিস্তার

২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আইএসকেপি-র মিডিয়া কৌশল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। আজাইম মিডিয়া ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সংগঠনটি এখন পশতু, দারি, আরবি, উর্দু, ফার্সি, উজবেক, তাজিক, ইংরেজি, রুশ এমনকি উইঘুরসহ দশটিরও বেশি ভাষায় ভিডিও তৈরি করতে সক্ষম [GNET](https://gnet-research.org/2024/06/27/iskps-latest-campaign-expanded-propaganda-and-external-operations/)। এই বহুভাষিক সক্ষমতা তাদের প্রচারণাকে সীমান্ত অতিক্রম করে মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সরাসরি অনুপ্রবেশ করতে সাহায্য করছে।

এই ভিডিওগুলো সাধারণত অত্যন্ত উচ্চমানের হয়, যেখানে উন্নত এডিটিং প্রযুক্তি, ড্রোন ফুটেজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত অনুবাদ সরঞ্জাম ব্যবহার করে 'জিহাদের অগ্রদূত' হিসেবে একটি মিথ্যা ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়। তবে, বিশুদ্ধ ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই আচরণ প্রাচীন 'খারিজি'দের বৈশিষ্ট্যের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়—যারা চরমপন্থী ব্যাখ্যার মাধ্যমে অন্য মুসলিমদের 'কাফের' (তাকফির) বলে আখ্যায়িত করে এবং নৃশংস হামলার অজুহাত তৈরি করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইএসকেপি-র ভিডিওর মূল বার্তা হলো—কেবল তারাই মুসলিমদের রক্ষা করতে সক্ষম, আর বর্তমান মুসলিম সরকার ও সংগঠনগুলো 'পশ্চিমা বা প্রাচ্যের দালাল' [ICCT](https://www.icct.nl/publication/voice-khurasan-inside-islamic-state-khurasan-provinces-english-language-magazine)।

ধর্মতাত্ত্বিক বিকৃতি: 'খোরাসানের কালো পতাকা'র বিভ্রান্তিকর উদ্ধৃতি

আইএসকেপি-র ভিডিওগুলোর সবচেয়ে প্রতারণামূলক দিক হলো 'খোরাসানের কালো পতাকা' সম্পর্কিত হাদিসের ভুল ব্যবহার। ইসলামি পরকালবিদ্যায় খোরাসান অঞ্চলের বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব থাকলেও, সমসাময়িক ইসলামি পণ্ডিতরা একমত যে, আইএসকেপি এই হাদিসগুলোকে প্রসঙ্গের বাইরে ব্যবহার করছে। তারা তরুণদের বিশ্বাসের আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদেরকে শেষ জামানার ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়নকারী হিসেবে উপস্থাপন করছে, যাতে তরুণরা তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে যোগ দেয়।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত 'ফলোয়ার্স অফ দ্য জিউস' (ইহুদিদের অনুসারী) নামক ভিডিওতে, আইএসকেপি আফগানিস্তানের ইসলামি আমিরাত (IEA) কর্তৃক শিয়া সম্প্রদায়কে সুরক্ষা এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে 'মূর্তিপূজা' এবং 'বিশ্বাসঘাতকতা' বলে আক্রমণ করে [SpecialEurasia](https://www.2024/07/01/analysis-iskp-video-followers-al-yahud/)। এই চরমপন্থী ও বর্জনীয় বর্ণনা ইসলামি সহনশীলতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। প্রকৃত মুসলিমদের কাছে এই ভিডিওগুলো কেবল রাজনৈতিক প্রচারণা নয়, বরং পবিত্র বিশ্বাসের অবমাননা।

ভূ-রাজনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ: মুসলিম দেশগুলোর স্বার্থে আঘাত

আইএসকেপি-র ভিডিও প্রচারণা কেবল ধর্মীয় স্তরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পেছনে স্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্য রয়েছে। সাম্প্রতিক ভিডিওগুলো থেকে দেখা যায়, সংগঠনটি মুসলিম দেশগুলোর সাথে বৃহৎ শক্তিগুলোর (যেমন চীন, রাশিয়া) সহযোগিতার সম্পর্ককে লক্ষ্যবস্তু করছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে আইএসকেপি ৩০ মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে তারা আফগান তালেবানের 'এক চীন' নীতিকে তীব্র নিন্দা জানায় এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) সহ 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' উদ্যোগের অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো ধ্বংস করার হুমকি দেয় [The Khorasan Diary](https://thekhorasandiary.com/2025/04/27/tkd-monitoring-iskp-releases-new-video-against-afghan-taliban-one-china-policy/)।

মুসলিম বিশ্বের সামগ্রিক স্বার্থে এই আক্রমণ অত্যন্ত ক্ষতিকর। মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন, অথচ আইএসকেপি সহিংসতা ও ভয়ের মাধ্যমে এই দেশগুলোকে বিশ্ব ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আইএসকেপি ভিডিওর মাধ্যমে নিজেদের 'বহুমুখী বিশ্বের অগ্রদূত' হিসেবে তুলে ধরছে এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মুসলিম ভূমিতে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা [Militant Wire](https://militantwire.com/2026/01/14/is-seeks-to-exploit-geopolitical-fracture-and-great-power-competition-to-strike-the-west-russia-and-china/)।

মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: নিয়োগ ও অনুপ্রবেশের নতুন ফ্রন্ট

মধ্য এশিয়ায় আইএসকেপি-র ভিডিও প্রচারণা অত্যন্ত আগ্রাসী। তাজিক ও উজবেক তরুণদের লক্ষ্য করে তৈরি 'দ্য ব্লেসড অ্যাটাক অফ টারমেজ'-এর মতো ভিডিওগুলোর মাধ্যমে তারা স্থানীয় আর্থ-সামাজিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে লোক নিয়োগ করছে [ORF Online](https://www.orfonline.org/research/iskps-recruiting-strategies-and-vulnerabilities-in-central-asia)। এই ভিডিওগুলো তথাকথিত 'সামাজিক ন্যায়বিচার'-এর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা কেবল অশান্তি ও রক্তপাত বয়ে আনে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডিজিটাল মাধ্যমে আইএসকেপি-র প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় আইএসকেপি-র প্রচারণামূলক ভিডিও টেলিগ্রাম ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, এমনকি তারা স্থানীয় ভাষা ও 'মিম' (Meme) ফরম্যাট ব্যবহার করে ১২ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের আকৃষ্ট করছে [Eurasia Review](https://www.eurasiareview.com/01022026-isis-sponsored-online-radicalization-is-growing-in-southeast-asia-oped/)। অপ্রাপ্তবয়স্কদের মগজ ধোলাইয়ের এই কর্মকাণ্ডকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইসলামি পণ্ডিত ও কমিউনিটি নেতারা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং এটিকে মুসলিম পারিবারিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বিশ্বাস রক্ষা: মুসলিম উম্মাহর করণীয়

'খোরাসান ভিডিও'র চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম বিশ্ব হাত গুটিয়ে বসে নেই। আফগানিস্তানের ইসলামি আমিরাত (IEA) আইএসকেপি-র ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করতে কঠোর সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে এবং তাদের 'খারিজি' বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করেছে [Crisis Group](https://www.crisisgroup.org/asia/south-asia/afghanistan/islamic-state-afghanistan-jihadist-threat-retreat)। একই সাথে, বিশ্বজুড়ে ইসলামি পণ্ডিতরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাল্টা বয়ান তৈরি করছেন, যা আইএসকেপি-র ভিডিওর ধর্মতাত্ত্বিক ভুলগুলো উন্মোচন করছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ মুসলিম স্কলারস (IUMS)-এর মতো সংগঠনগুলো বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে, প্রকৃত 'জিহাদ' হলো নিজের ঘরবাড়ি রক্ষা করা, ন্যায়বিচারের সন্ধান করা এবং জনকল্যাণ সাধন করা; সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালানো বা মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা নয় [IUMS Online](https://www.iumsonline.org/en/ContentDetails.aspx?ID=32541)। বিশ্বাস রক্ষার যুদ্ধ কেবল ভৌত জগতে নয়, ডিজিটাল জগতেও চলছে। মুসলিম সম্প্রদায়কে তরুণদের শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে এবং তাদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা ধর্মের লেবাসে আসা এই চরমপন্থী প্রচারণাকে চিনতে ও প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

উপসংহার: চরমপন্থার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ

'খোরাসান ভিডিও'র বিস্তার সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। এই ভিডিওগুলো চমৎকার উপস্থাপনা ও চরমপন্থী বর্ণনার মাধ্যমে মুসলিমদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে চায়। তবে, মুসলিম উম্মাহ যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, মধ্যপন্থা (Wasatiyyah) নীতিতে অটল থাকে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সক্রিয়ভাবে পাল্টা জবাব দেয়, তবে আইএসকেপি-র মিথ্যা একদিন অবশ্যই ভেঙে পড়বে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, মুসলিম বিশ্বের স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা রক্ষা করার দায়িত্ব প্রতিটি মুসলিমের—আর এর শুরুটা হতে হবে এই মিথ্যা 'খোরাসানের ছায়া'কে চিনে তা প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে।

মন্তব্য

comments.comments (0)

Please login first

Sign in