সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামিক স্টেট (আইএস) সংগঠনের কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামিক স্টেট (আইএস) সংগঠনের কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

Isaac Alkire@isaacalkire
1
0

এই নিবন্ধে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত 'ইসলামিক স্টেট' সংগঠনের নতুন রূপান্তর, খোরাসান ও আফ্রিকা শাখাগুলোর শক্তিশালী হওয়া এবং এই ফিতনার বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের অবস্থান বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

নিবন্ধের তথ্যসূত্র

এই নিবন্ধে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত 'ইসলামিক স্টেট' সংগঠনের নতুন রূপান্তর, খোরাসান ও আফ্রিকা শাখাগুলোর শক্তিশালী হওয়া এবং এই ফিতনার বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের অবস্থান বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

  • এই নিবন্ধে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত 'ইসলামিক স্টেট' সংগঠনের নতুন রূপান্তর, খোরাসান ও আফ্রিকা শাখাগুলোর শক্তিশালী হওয়া এবং এই ফিতনার বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের অবস্থান বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বিভাগ
ফ্রন্টলাইন আপডেট
লেখক
Isaac Alkire (@isaacalkire)
প্রকাশিত
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ এ ০৩:৫০ PM
হালনাগাদ করা হয়েছে
১ মে, ২০২৬ এ ০৩:২০ PM
প্রবেশাধিকার
সর্বজনীন নিবন্ধ

ভূমিকা: 'ইসলামিক স্টেট'-এর নতুন রূপ এবং বৈশ্বিক হুমকি

২০২৬ সালে পদার্পণ করা আজকের পৃথিবীতে, 'ইসলামিক স্টেট' (আইএস) সংগঠনটি ২০১৪ সালের মতো বিশাল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণকারী 'রাষ্ট্র' কাঠামো থেকে পুরোপুরি সরে এসে একটি বৈশ্বিক, বিকেন্দ্রীভূত কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। যদিও এই সংগঠনটি ২০১৯ সালে সিরিয়ার বাঘুজ অঞ্চলে ভৌগোলিকভাবে পরাজিত হয়েছিল, তবে এর আদর্শিক বিষ এবং আঞ্চলিক শাখাগুলো এখনও মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিশ্বশান্তির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে [Source](https://icct.nl/publication/the-islamic-state-in-2025-an-evolving-threat-facing-a-waning-global-response/)। গত দুই বছরে, বিশেষ করে ২০২৪ সাল থেকে, এই সংগঠনের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ায় বেশি স্থানান্তরিত হয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংগঠনের কার্যক্রমের গতিপথ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং এই খারিজি ফিতনার বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

খোরাসান শাখা (ISIS-K): মধ্য এশিয়া ও রাশিয়ার ওপর নতুন হামলা

সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো আফগানিস্তান ভিত্তিক 'খোরাসান শাখা'র (ISIS-K) শক্তিশালী হওয়া। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর 'ক্রোকাস সিটি হল' (Crocus City Hall) কনসার্ট হলে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা, যাতে ১৪০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়, এই শাখার দূরপাল্লার ও জটিল অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে [Source](https://www.stimson.org/2024/moscow-attack-reflects-russian-intelligence-weakness-and-isis-k-ambitions/)। এই হামলা কেবল রাশিয়ার জন্যই নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

এর আগে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইরানের কেরমান শহরে কাসেম সোলেইমানির স্মরণসভায় জোড়া বিস্ফোরণে প্রায় ১০০ জন নিহত হয়, যার জন্য খোরাসান শাখাই দায়ী ছিল [Source](https://www.theguardian.com/world/2024/mar/23/islamic-states-deadly-moscow-attack-highlights-its-fixation-with-russia)। এই কর্মকাণ্ডগুলো প্রমাণ করে যে, আইএস তাদের 'শত্রু' তালিকা দীর্ঘ করছে এবং মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরে মাজহাবি বা উপদলীয় সংঘাত উসকে দেওয়ার পাশাপাশি বড় শক্তিগুলোর মধ্যকার শূন্যতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার আইএসের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালালেও, সংগঠনের গোপন নেটওয়ার্কগুলো এখনও এই অঞ্চলে সন্ত্রাসের বীজ বপন করে চলেছে।

আফ্রিকা: সন্ত্রাসের নতুন কেন্দ্রবিন্দু

২০২৫ সাল নাগাদ আফ্রিকা মহাদেশ, বিশেষ করে সাহেল অঞ্চল (মালি, নাইজার, বুরকিনা ফাসো) আইএসের সবচেয়ে সক্রিয় বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা শক্তিগুলোর, বিশেষ করে ফ্রান্সের এই অঞ্চলগুলো থেকে প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তা শূন্যতার সুযোগ আইএসের 'সাহেল শাখা' (ISSP) কার্যকরভাবে গ্রহণ করেছে [Source](https://www.parliament.uk/business/publications/research/briefing-papers/CBP-10234/countering-islamic-statedaesh-in-africa-syria-and-iraq-2025)।

এই অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য এবং উপজাতীয় দ্বন্দ্ব আইএসের সদস্য সংগ্রহের জন্য উর্বর ভূমি হিসেবে কাজ করেছে। নাইজেরিয়ার উত্তরে 'পশ্চিম আফ্রিকা শাখা' (ISWAP) স্থানীয় জনগণকে নিয়ন্ত্রণ এবং কর আদায়ের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করেছে। আফ্রিকার এই বিস্তার কেবল একটি সামরিক হুমকিই নয়, বরং এটি স্থানীয় মুসলিম সমাজের সামাজিক কাঠামো ধ্বংসকারী একটি বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে [Source](https://ict.org.il/the-rise-of-the-islamic-state-in-africa-in-the-sahel-west-and-east-africa/)।

সিরিয়া ও ইরাক: ভূখণ্ডহীন সংগঠনের পুনরুত্থানের প্রচেষ্টা

২০২৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তন আইএসের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছিল। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলে আইএসের হামলায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে [Source](https://sfuturem.org/escalation-of-activity-by-the-islamic-state-isis-against-the-syrian-transitional-government/)। সংগঠনটি সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (SDF) নিয়ন্ত্রিত কারাগারগুলো থেকে তাদের সদস্যদের মুক্ত করার জন্য 'দেয়াল ভাঙা' (Breaking the Walls) কৌশল অব্যাহত রেখেছে।

ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতায় রূপান্তরিত হয়েছে [Source](https://www.state.gov/joint-statement-announcing-the-timeline-for-the-end-of-the-military-mission-of-the-global-coalition-to-defeat-isis-in-iraq/)। যদিও ইরাকি সেনাবাহিনী আইএসের অবশিষ্টাংশের বিরুদ্ধে ক্রমাগত অভিযান চালাচ্ছে, তবে সংগঠনের গোপন সেলগুলো পাহাড়ি ও মরুভূমি অঞ্চলে এখনও বিদ্যমান। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, মুসলিম দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষায় বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর করার চেয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা কতটা জরুরি।

ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি: আইএস — উম্মাহর হৃদয়ে বিদ্ধ এক খঞ্জর

ইসলামি শরিয়াহ এবং আলেমদের মতে, আইএস সংগঠনটি বর্তমান যুগের 'খারিজি'। তাদের কর্মকাণ্ড ইসলামের রহমত, ন্যায়বিচার ও শান্তির নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলো, যার মধ্যে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরবের গ্র্যান্ড ওলামা কাউন্সিল এবং ওয়ার্ল্ড ইউনিয়ন অফ মুসলিম স্কলারস অন্তর্ভুক্ত, আইএসকে 'ইসলামের শত্রু' হিসেবে ঘোষণা করেছে [Source](https://www.wilsoncenter.org/article/muslims-against-isis-part-1-clerics-scholars)।

আইএস সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে মুসলমানদের। তাদের হামলায় নিহতদের বিশাল অংশই নিরপরাধ মুসলিম। এছাড়া তাদের জঘন্য কর্মকাণ্ড পশ্চিমা বিশ্বে 'ইসলামোফোবিয়া' (ইসলামভীতি) বৃদ্ধিতে, মুসলমানদের একঘরে করতে এবং ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে ভূমিকা রেখেছে। প্রকৃত জিহাদ হলো জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, অথচ আইএসের কর্মকাণ্ড হলো ফিতনা সৃষ্টি, নিরপরাধ হত্যা এবং উম্মাহকে বিভক্ত করা [Source](https://www.independent.co.uk/news/world/asia/70000-indian-muslim-clerics-issue-fatwa-against-isis-the-taliban-alqaeda-and-other-terror-groups-a6770241.html)।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক খেলা

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সামরিক, অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল ক্ষেত্রে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রিপোর্ট অনুযায়ী, আইএসের অনলাইন প্রচারণা বন্ধ এবং আর্থিক উৎসগুলো বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে [Source](https://www.securitycouncilreport.org/what-in-blue/2026/02/counter-terrorism-briefing-on-the-secretary-generals-strategic-level-report-on-isil-daesh-3.php)। তবে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা (যেমন ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আমেরিকা-চীন প্রতিযোগিতা) সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

মুসলিমদের দৃষ্টিকোণ থেকে, পশ্চিমা দেশগুলোর সন্ত্রাসবাদ বিরোধী নীতিতে প্রায়ই 'দ্বিমুখী নীতি' পরিলক্ষিত হয়। একদিকে আইএসের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে, অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদের মূল কারণ যেমন রাজনৈতিক অবিচার, উপনিবেশবাদের অবশিষ্টাংশ এবং ফিলিস্তিন ইস্যুর মতো উম্মাহর যন্ত্রণাদায়ক বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এই ধরনের একতরফা নীতি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোকে 'আমরা ন্যায়ের জন্য লড়ছি'—এমন মিথ্যা দাবি করার সুযোগ করে দিচ্ছে [Source](https://www.un.org/press/en/2025/sc15584.doc.htm)।

উপসংহার: উম্মাহর মুক্তি ঐক্য ও সচেতনতায়

'ইসলামিক স্টেট' সংগঠনের হুমকি মোকাবিলা কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। এটি একটি আদর্শিক যুদ্ধ। মুসলিম সমাজকে তাদের অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তরুণদের সঠিক ইসলামি জ্ঞান প্রদান করতে হবে, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

আইএসের মতো ফিতনা সৃষ্টিকারী সংগঠনের বিলুপ্তি উম্মাহর ঐক্য, আলেমদের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং বিশ্বব্যাপী অবিচার অবসানের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, ইসলাম হলো জগতসমূহের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত ধর্ম, আর সন্ত্রাসবাদ হলো এই রহমতের প্রতি করা সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা।

মন্তব্য

comments.comments (0)

Please login first

Sign in