ভারতীয় শিকড় থাকা সত্ত্বেও অঙ্কগুলোকে ‘আরবি সংখ্যা’ বলা হয় কেন?

ভারতীয় শিকড় থাকা সত্ত্বেও অঙ্কগুলোকে ‘আরবি সংখ্যা’ বলা হয় কেন?

Muslim Post Editorial Desk@muslimpost

দশমিক স্থানমান ও শূন্যের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ ঘটেছে ভারতে। আরবি ভাষার গণিতচর্চা, লাতিন পাণ্ডুলিপি ও ফিবোনাচ্চির কাজের মাধ্যমে পদ্ধতিটি ইউরোপে কীভাবে পৌঁছায়, প্রমাণসহ জানুন।

০–৯ অঙ্ককে ‘আরবি সংখ্যা’ বলা হয় প্রধানত এই কারণে যে আরবি ভাষায় লেখালেখি করা পণ্ডিতেরা ভারতীয় উৎসের অঙ্ক দিয়ে হিসাব করার পদ্ধতি ব্যাখ্যা ও প্রচার করেছিলেন। নামটি জ্ঞান চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বোঝায়; একজন আরব গণিতবিদ সব কটি আধুনিক অঙ্ক একাই বানিয়েছিলেন, এমন দাবি করে না। দশমিক স্থানমান পদ্ধতি এবং শূন্যের গুরুত্বপূর্ণ শিকড় ভারতে। সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত-ইতিহাসের পর্যালোচনা দেখায়, অঙ্কের চেহারা, গণনার নিয়ম ও দৈনন্দিন ব্যবহার ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন সময়ে বদলেছে।

৯৭৬ (976) সালে স্পেনে লেখা একটি পাণ্ডুলিপিতে ভারতীয় উৎসের অঙ্ক দেখা যায়। সেটি পিসার লিওনার্দো, অর্থাৎ ফিবোনাচ্চির ১২০২ (1202) সালের Liber abaci গ্রন্থেরও আগের। তিনি বইটি ১২২৮ (1228) সালে সংশোধন করেন। পুরোনো পাণ্ডুলিপি প্রমাণ করে যে ফিবোনাচ্চির আগে ইউরোপের কোথাও কোথাও এসব চিহ্ন পরিচিত ছিল। তাঁর বই আরও পাঠককে নিয়ম শিখতে ও কাজে লাগাতে সাহায্য করে। কিন্তু কোনো প্রমাণই বলে না যে সব ব্যবসায়ী বা দপ্তরের লেখক সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো পদ্ধতি ছেড়ে দেন। চিহ্ন চিনতে পারা, তা দিয়ে হিসাব করা এবং সমাজজুড়ে তা ব্যবহার করা তিনটি আলাদা স্তর।

প্রচ্ছদের ছবিটি এআই-সহায়তায় তৈরি একটি মৌলিক ঐতিহাসিক পুনর্গঠন। এটি টিকে থাকা কোনো নির্দিষ্ট পাণ্ডুলিপি, শনাক্ত করা কর্মশালা কিংবা নথিভুক্ত সাক্ষাতের আলোকচিত্র নয়।

‘আরবি সংখ্যা’ নামটি আসলে কী বোঝায়?

ঘড়ি, দোকানের রসিদ ও শ্রেণিকক্ষের বোর্ডে আমরা ০–৯ অঙ্ক দেখি। কিন্তু অঙ্কের আঁকা রূপ, সংখ্যায় তার মান এবং হিসাবের নিয়ম এক জিনিস নয়। ৫০৭ সংখ্যায় ৫ মানে পাঁচশো, ০ দশকের খালি স্থান ধরে রাখে, আর ৭ মানে সাত একক। ৫৭ সংখ্যায় একই ৫-এর মান পঞ্চাশ। দুটি সংখ্যা যোগ করতে হলে এককের ঘরের যোগফল ৯-এর বেশি হলে কীভাবে হাতে এক রেখে দশকের ঘরে নেওয়া হয়, সেটিও জানতে হয়। শুধু অঙ্কের আকার দেখে সেই নিয়ম শেখা যায় না।

স্থান অনুযায়ী মান নির্ধারণের এই পদ্ধতি ভারতীয় গণিতচর্চায় বিকশিত হয়। আরবি ভাষায় লেখালেখি করা গণিতবিদেরা ভারতীয় অঙ্কভিত্তিক নিয়ম অধ্যয়ন, ব্যাখ্যা ও শিক্ষা দিয়েছেন। পরে লাতিন ভাষার লেখা এবং ইউরোপের শিক্ষার মধ্য দিয়ে সেই জ্ঞানের অংশ ছড়িয়েছে। ‘হিন্দু-আরবি অঙ্ক’ নামটি তাই আরও বেশি ধাপ মনে করিয়ে দেয়। তবু তার মানে নয় যে ভারত, পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপের সবাই ঠিক একইভাবে প্রতিটি অঙ্ক লিখতেন। ম্যাকটিউটরের ঐতিহাসিক আলোচনা আরবি ভাষাভাষী বিশ্বের পূর্ব ও পশ্চিমের অঙ্কের ভিন্ন রূপ আলাদা করে দেখায়।

তাই ‘আরবি সংখ্যা কে আবিষ্কার করেছিলেন’ প্রশ্নের আগে নির্দিষ্ট করে বলতে হয় আমরা কী খুঁজছি। একটি অঙ্কের আঁকা চেহারা, স্থানমানের মূলনীতি, খালি ঘরের চিহ্ন, সংখ্যা হিসেবে শূন্য, নাকি কাগজে হিসাবের প্রক্রিয়া? তারিখ জানা কোনো বস্তুতে একটি চিহ্ন থাকতে পারে; তাতে পুরো পদ্ধতি এক দিনে একজনের হাতে তৈরি হয়েছে বলে প্রমাণ হয় না। আজ ছাপায় দেখা ০–৯-এর রূপও দীর্ঘ ইতিহাসের ফল, প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে সেই একই ছাপার অক্ষর কল্পনা করা ঠিক নয়।

শূন্য কি শুধু ফাঁকা ঘর বোঝানোর চিহ্ন?

৫০৭ সংখ্যার শূন্যটি না থাকলে সেটিকে ৫৭-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যায়। সেখানে ০ একটি খালি দশকের স্থান ধরে। আবার ‘সাত বিয়োগ সাত’ করলে ফল হিসেবে শূন্য পাওয়া যায়; সেই ফল পরের হিসাবেও ব্যবহার করা যায়। দুটি কাজ সম্পর্কিত হলেও পুরোনো কোনো নথিতে ফাঁকা ঘরের চিহ্ন দেখেই বলা যায় না যে লেখক শূন্য নিয়ে আধুনিক সব গাণিতিক নিয়ম জানতেন। সেন্ট অ্যান্ড্রুজের শূন্যের ইতিহাস স্থানধারক চিহ্ন ও সংখ্যা হিসেবে শূন্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ব্যাখ্যা করে।

স্থানমানের কারণে অল্প কয়েকটি অঙ্ক দিয়ে বড় বড় সংখ্যা লেখা যায়। আজকের উদাহরণ ৫০৭ + ২৬ = ৫৩৩ নেওয়া যাক। সাত ও ছয় যোগে তেরো হয়; তিনটি একক লিখে হাতে এক রেখে দশকের ঘরে নেওয়া হয়। দশকের ঘরে শূন্য, দুই এবং বহন করে আনা এক মিলিয়ে তিন দশক হয়। উদাহরণটি আধুনিক পাঠকের জন্য নিয়ম বোঝায়। নবম শতকের কোনো পণ্ডিত আজকের বাংলা ছাপার অঙ্ক বা স্কুলের খাতার একই বিন্যাস ব্যবহার করতেন, এমন ঐতিহাসিক দাবি এখানে করা হচ্ছে না।

আগে কিছু গণনা ধুলো ছড়ানো ফলকে হত, যেখানে চিহ্ন মুছে ফেলা বা সরানো যেত। এমন কাজের প্রতিটি মধ্যবর্তী ধাপ টিকে থাকবে, তা আশা করা যায় না। অন্যদিকে প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে শুধু একটি বিন্দু পেলেও সম্পূর্ণ শূন্যতত্ত্ব উদ্ধার করা যায় না। বিন্দুটি পুরো সংখ্যার কোথায় আছে, আশপাশের লেখায় কী বলা হয়েছে এবং কোন হিসাব সত্যিই দেখানো হয়েছে, সব দেখতে হয়। এই কাজ ছাড়া বিভিন্ন যুগের চিহ্ন তুলনা করলে প্রমাণের ওপর এমন অর্থ চাপিয়ে দেওয়া হয় যা সেখানে নেই।

ব্রহ্মগুপ্ত ও গোয়ালিয়রের শিলালিপি কী প্রমাণ করে?

ব্রহ্মগুপ্ত ৬২৮ (628) সালে ব্রাহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত রচনা করেন। সেখানে শূন্য, ধনাত্মক ও ঋণাত্মক সংখ্যা নিয়ে নিয়ম আলোচনা করেছেন। সেন্ট অ্যান্ড্রুজে তাঁর জীবনী নিয়মগুলোর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে, পাশাপাশি জানায় যে শূন্য দিয়ে ভাগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য আধুনিক গণিতের সঙ্গে মেলে না। এই সীমাটি তাঁর অবদান অস্বীকার করে না; বরং বইটি তার নিজস্ব সময়ের প্রেক্ষাপটে পড়তে সাহায্য করে। একটি সংরক্ষিত বইয়ের রচনাসাল দেখে তার আগে কেউ স্থানমান বুঝতেন না, এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না।

৮৭৬ (876) সালে তারিখ দেওয়া গোয়ালিয়রের শিলালিপি অন্য রকম সাক্ষ্য। সেখানে শূন্যের একটি চিহ্ন এমন বস্তুতে আছে যার অবস্থান ও সময় নির্ধারণ করা যায় এবং যা এখনও পরীক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু পাথর খোদাইয়ের সাল ‘শূন্যের জন্মদিন’ নয়। আগের উদাহরণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে; অন্য অঞ্চলের ব্যবহার জানতে সেই অঞ্চলের নিজস্ব সূত্র দেখতে হবে। ‘তারিখযুক্ত, টিকে থাকা একটি উদাহরণ’ বলা তাই ‘মানুষের ইতিহাসে শূন্যের প্রথম ব্যবহার’ বলার চেয়ে অনেক সংকীর্ণ এবং প্রমাণসম্মত।

গণিতের বই কথায় কথায় কোনো নিয়ম ব্যাখ্যা করতে পারে, পাথরের শিলালিপি নির্দিষ্ট বস্তুতে নির্দিষ্ট চিহ্ন দেখায়। মুছে ফেলা যায় এমন ফলক আবার হিসাবের সব পদক্ষেপ ধরে রাখে না। এই সূত্রগুলো আলাদা প্রশ্নের উত্তর দেয়। কোনো চিহ্ন খালি ঘর ধরে রেখেছে কি না, তা পুরো সংখ্যার মধ্যে দেখতে হবে। শূন্য গণনায় ব্যবহৃত হয়েছে কি না, জানতে স্পষ্ট নিয়ম বা হিসাবের উদাহরণ দরকার। সব তথ্য এক ‘আবিষ্কারকের’ গল্পে গুঁজে দিলে এই প্রমাণগত পার্থক্য হারিয়ে যায়।

বাখশালি পাণ্ডুলিপির বয়স নিয়ে বিতর্ক কেন?

অক্সফোর্ডে সংরক্ষিত বাখশালি পাণ্ডুলিপিতে সংখ্যা লেখার সময় বিন্দুর ব্যবহার দেখা যায়। বডলিয়ান লাইব্রেরি ২০১৭ (2017) সালে তেজস্ক্রিয় কার্বন পদ্ধতিতে বয়স নির্ণয়ের ফল জানায়। পরীক্ষা করা হয়েছিল বার্চ গাছের ছালের কয়েকটি টুকরা; লাইব্রেরি ফলকে শূন্যচিহ্নের বয়সের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করেছিল। পরীক্ষাগার যে উপাদান পরীক্ষা করেছে, তার সম্পর্কে মাপটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। কিন্তু লেখক কবে সেই ছালে লিখেছেন, তা সরাসরি মাপে না; পাণ্ডুলিপির সব পাতা একই সময়ে লেখা হয়েছে, এটিও একা প্রমাণ করে না। পুরোনো উপাদানে পরে লেখা সম্ভব।

কিম প্লফকার ও তাঁর সহলেখকদের গবেষণামূলক জবাব সবচেয়ে পুরোনো ছালের বয়সকে পুরো লেখার বয়স ধরে নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং গণনায় বিন্দুর কাজ পরীক্ষা করে। এ আপত্তি উপাদানের পরীক্ষার ফল মুছে দেয় না। এটি দেখায় উপাদানের বয়স, অক্ষর লেখার সময় এবং চিহ্নের গাণিতিক অর্থ আলাদাভাবে বিচার করতে হবে। পরীক্ষাগারের একটি সংখ্যা এই তিন প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে দেয় না। উৎসের দাবি ও গবেষকদের আপত্তি পাশাপাশি পড়লেই বিতর্কের প্রকৃত বিষয় বোঝা যায়।

ফলে ‘বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো শূন্য’ কথাটির অর্থ পরিষ্কার করা দরকার। পুরোনো বলতে পরীক্ষা করা ছালের টুকরা, তার ওপর লেখা পাঠ, খালি স্থানের চিহ্ন, নাকি শূন্যকে সংখ্যা হিসেবে নেওয়ার নিয়ম বোঝানো হচ্ছে? ব্রহ্মগুপ্তের গ্রন্থ, গোয়ালিয়রের খোদাই এবং বাখশালি পাণ্ডুলিপি ভিন্ন ধরনের সাক্ষ্য। ইতিহাসে তাদের গুরুত্ব বুঝতে একটি অভিন্ন ‘আবিষ্কারের তারিখ’ খোঁজার দরকার নেই। বরং কোন সাক্ষ্য কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তা নির্ধারণ জরুরি।

আল-খোয়ারিজমির পাটিগণিত ও বীজগণিতে ভূমিকা কী?

আল-খোয়ারিজমি খ্রিষ্টীয় নবম শতকের আব্বাসীয় জ্ঞানচর্চার পরিবেশে কাজ করেছিলেন। ভারতীয় অঙ্ক দিয়ে হিসাবের একটি আরবি ভাষার বই তাঁর নামে পরিচিত, কিন্তু সেই পাটিগণিতের আরবি মূল পাঠ টিকে নেই। পরে রচিত লাতিন লেখা জ্ঞান ছড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য, যদিও এগুলো অনুলিপি ও সম্পাদনার নানা ধাপ পেরিয়েছে। সেন্ট অ্যান্ড্রুজের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা মূল আরবি বইয়ের শিরোনাম নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা বলে। কাজেই তাঁর প্রভাব স্বীকার করা যায়, কিন্তু অনেক পরে পাওয়া লাতিন বাক্যকে হারানো বইয়ের হুবহু উদ্ধৃতি বলা যায় না।

বীজগণিত নিয়ে তাঁর গ্রন্থ আর ভারতীয় অঙ্ক দিয়ে হিসাব ব্যাখ্যা করা বই একই পাঠ্য নয়। আল-খোয়ারিজমি সম্পর্কে সেন্ট অ্যান্ড্রুজের জীবনী এই দুই ক্ষেত্র আলাদা করে আলোচনা করে। তাঁর নামের লাতিন রূপ পরে ‘অ্যালগরিদম’ শব্দের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। এটি হিসাব শেখানোর ওপর তাঁর প্রভাবের চিহ্ন। তবে আজ ব্যবহৃত সব অঙ্কের আকৃতি তিনি নিজ হাতে তৈরি করেছেন বা বর্তমান কালে ‘অ্যালগরিদম’ নামে পরিচিত প্রত্যেক পদ্ধতি তাঁর আবিষ্কার, এমন নয়।

৭৬২ (762) সালে বাগদাদ প্রতিষ্ঠা নিয়ে বাংলা নিবন্ধটি পরবর্তী পণ্ডিতদের কাজের নগর-ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে, কিন্তু হারানো পাটিগণিতের বইয়ের অনুলিপি নয়। ইজাজা ও জ্ঞান পরিবহন নিয়ে বাংলা নিবন্ধটি শিক্ষক, ছাত্র ও পাণ্ডুলিপির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে। কোনো শিক্ষাদানের অনুমতি থাকলেই একটি বিশেষ গণনানিয়ম ঠিক কোন পথে ভারত থেকে ইউরোপে পৌঁছেছিল, তা প্রমাণ হয় না। পটভূমি ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ আলাদা রাখতে হবে।

আরবি ভাষার সব অঞ্চলে অঙ্কের রূপ কি এক ছিল?

না। আরবি ভাষায় লেখালেখি করা বিশ্বের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে ভারতীয় উৎসের অঙ্ক নানা রূপ নিয়েছিল। পশ্চিমের রূপগুলোর সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপে পরিচিত হয়ে ওঠা চিহ্নের ঐতিহাসিক সম্পর্ক বেশি ঘনিষ্ঠ। পূর্বের রূপ অন্য পরিবেশে ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখনও দেখা যায়। একই স্থানমানের নিয়ম বজায় থাকতে পারে, যদিও লেখক একটি অঙ্ক অন্যভাবে আঁকেন। তাই ‘আরবি’ বলতে বহু শতাব্দী ধরে সবাই ব্যবহার করেছে এমন অপরিবর্তিত একটি হরফ বা ছাপার ধরন বোঝায় না।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত অটোমান যুগের কম্পাস ও সূর্যঘড়িতে স্কেলের ওপর পূর্বাঞ্চলীয় অঙ্কের রূপ দেখা যায়। জাদুঘর বস্তুটির সময় আনুমানিক ১৫৮২–১৫৮৩ (1582–1583) বলে জানায়। এটি পরবর্তী সময়ে চিহ্নগুলোর ব্যবহার দেখতে সাহায্য করে, কিন্তু নবম শতকে কোথায় প্রথম অঙ্কগুলো আঁকা হয়েছিল তা সরাসরি প্রমাণ করে না। একটি বস্তুর তারিখ, কাজ ও উৎস প্রথমে সেই বস্তুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি উদাহরণ থেকে সব অঞ্চলের ইতিহাস একরকম ধরে নেওয়া যাবে না।

ইন্টারনেটে আরেকটি ছবি ঘোরে: আধুনিক অঙ্কের যত মান, তার প্রাথমিক আকারে নাকি তত কোণ ছিল। এখানে ব্যবহৃত তারিখযুক্ত পাণ্ডুলিপি ও বস্তু ওই ছবির পক্ষে ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রমাণ তৈরি করে না। পরের যুগের কেউ নিজের ইচ্ছামতো কোণ এঁকে সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন; এতে পুরোনো লেখকেরা কীভাবে লিখতেন তা জানা যায় না। অঙ্কের রূপের ইতিহাস জানতে একের পর এক তারিখযুক্ত ও উৎস-জানা উদাহরণ দরকার, কেবল মনে রাখার মতো ছবি নয়।

ফিবোনাচ্চির আগে ইউরোপে এসব অঙ্ক জানা ছিল?

হ্যাঁ। সেন্ট অ্যান্ড্রুজের ইতিহাস আলোচনায় স্পেনে ৯৭৬ সালে লেখা Codex Vigilanus পাণ্ডুলিপিকে ভারতীয় উৎসের অঙ্কের একটি পুরোনো সংরক্ষিত ইউরোপীয় সাক্ষ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। একটি পাণ্ডুলিপি বলে যে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে কেউ চিহ্নগুলো জানতেন। ইউরোপের সব স্কুল, কর দপ্তর ও ব্যবসায়ী তখন একই পদ্ধতিতে হিসাব করতেন, এমন সিদ্ধান্ত দেয় না। অনুবাদ, পাঠদান ও ভূমধ্যসাগরীয় যোগাযোগ ভিন্ন সময়ে ভিন্ন পথে জ্ঞান ছড়িয়েছে।

পিসার লিওনার্দো বা ফিবোনাচ্চি ১২০২ সালের Liber abaci বইতে অঙ্কগুলো এবং বাস্তব জীবনের নানা হিসাব দেখান; ১২২৮ সালে বই সংশোধন করেন। সেন্ট অ্যান্ড্রুজে ফিবোনাচ্চির জীবনী তাঁর শিক্ষা ও ব্যবহারিক উদাহরণের কথা বলে। তিনি প্রভাবশালী লেখক ও শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু ৯৭৬ সালের সাক্ষ্য থাকলে তাঁকে এসব অঙ্ক দেখা প্রথম ইউরোপীয় বলা যায় না। প্রভাবশালী বই প্রকাশ আর সব দৈনন্দিন নথির লেখা বদলানোও দুটি আলাদা প্রক্রিয়া।

নতুন ও পুরোনো পদ্ধতি দীর্ঘকাল পাশাপাশি ছিল। আইসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে থাকা প্রাচীন নর্স Algorismus পাণ্ডুলিপির গবেষণা স্থানমান শেখানোর ধরন পরীক্ষা করে। চতুর্দশ শতকের GKS 1812 4to পাণ্ডুলিপিতে বহু সংখ্যা শব্দে বা রোমান অঙ্কে লেখা, যদিও অন্যত্র ভারতীয়-আরবি অঙ্কও আছে। নতুন পদ্ধতি জানলেই প্রতিটি সংখ্যা তৎক্ষণাৎ নতুনভাবে লিখতে হয় না। পাণ্ডুলিপিটি লেখক সরাসরি ফিবোনাচ্চির কাছে শিখেছিলেন, সেটিও প্রমাণ করে না।

সুনির্দিষ্ট গণনা নানা কাজে লাগে। আল-বাত্তানির পর্যবেক্ষণ ও ত্রিকোণমিতি নিয়ে বাংলা নিবন্ধ এমন একটি ঐতিহাসিক কাজের পরিবেশ তুলে ধরে, কিন্তু কোন নির্দিষ্ট ঘটনা অঙ্কগুলোকে ইউরোপে পৌঁছাল তা বলে না। আধুনিক ২০২৭ সালের রমজানের দিন পরিকল্পনা নিয়ে বাংলা নির্দেশিকা শুধু একটি তুলনা দেয়: আগাম গণিতের ফল আর স্থানীয় চাঁদ দেখার পরে নেওয়া সিদ্ধান্ত একই জিনিস নয়। এই তুলনা আজকের গণনা ও পর্যবেক্ষণের পার্থক্য বোঝাতে সাহায্য করে; এটি মধ্যযুগের অঙ্কপ্রচারের দলিল নয়।

‘শয়তানি’ বলে কি ইউরোপজুড়ে শূন্য নিষিদ্ধ হয়েছিল?

জনপ্রিয় একটি গল্পে বলা হয়, গির্জা বা শাসকেরা শূন্যকে শয়তানের চিহ্ন ভেবে গোটা ইউরোপে নিষিদ্ধ করেছিলেন। গণিত-ইতিহাসবিদ সি. ফিলিপ ই. নটহাফ এই গল্পের উৎস যাচাই করেছেন। এমন সর্বজনীন ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তিনি পাননি। গবেষণাটি একটি অতি বিস্তৃত দাবির সমালোচনা করে। এর মানে এই নয় যে কোথাও কোনো শহর নির্দিষ্ট আর্থিক নথিতে সংখ্যা লেখার নিয়ম করেনি। স্থানীয় নিয়ম ও গোটা মহাদেশের ধর্মীয় আদেশ এক কথা নয়।

যদি দাবি করা হয় কোনো শহর টাকার অঙ্ক পরে বদলে দেওয়া ঠেকাতে নিয়ম করেছিল, তবে সেই নথি, স্থান, সময় ও কার ওপর তা প্রযোজ্য ছিল জানতে হবে। একটি শহরের দপ্তরের নিয়মকে পুরো ইউরোপের সব গির্জার সিদ্ধান্ত বলা যাবে না। লেখকের অভ্যাস, লেখার উপকরণ, শেখার পদ্ধতি ও গণনার যন্ত্রও পরিবর্তনের গতিতে ভূমিকা রাখে। কোনো একটি কারণকে নির্দিষ্ট করে প্রমাণ করতে সেই পরিবেশের প্রামাণ্য নথি দরকার; সহজে মনে থাকে এমন গল্প যথেষ্ট নয়।

সংক্ষেপে, স্থানমান ও শূন্যের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ ভারতে ঘটেছে; আরবি ভাষার পণ্ডিতেরা পদ্ধতি ব্যাখ্যা ও প্রচার করেছেন; ইউরোপের পাঠকেরা নানা বই ও যোগাযোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তা শিখেছেন। কোথাও ‘প্রথম’ বা ‘আবিষ্কারক’ শব্দ শুনলে প্রশ্ন করুন প্রমাণটি আসলে কিসের: গাছের ছাল, পাথরের খোদাই, হিসাবের নিয়ম, লাতিন পাণ্ডুলিপি, অঙ্কের আকৃতি, নাকি দৈনন্দিন ব্যবহার? এই সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন একটি নাম ও একটি সালের গল্পের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য ইতিহাস দেয়।

তথ্যসূত্র